গুলশা মাছ (Gulsha Fish): পরিচিতি, চাষপদ্ধতি ও রোগ ব্যাবস্থাপনা

বাংলাদেশের ছোট মাছগুলোর মধ্যে গুলশা মাছ (Gulsha Fish, Gulsha Tengra, Mystus bleekeri) আবহমান কাল থেকে বাঙ্গালীদের খুব প্রিয় মাছ হিসেবে সমাদৃত। মাছটি খেতে খুব সুস্বাদু এবং বাজার মূল্যও অনেক বেশী।

গুলশা মাছ (Gulsha Fish, Gulsha Tengra, Mystus bleekeri) একটি স্বাদুপানির স্থানীয় নাম।

সাধারণ নাম : গুলসা টেংরা, গুইল্লা টেংরা, লাইট্ট টেংরা, River Gulsha, দেশী গুলসা

গুলশা মাছের বৈজ্ঞানিক নাম : মাইষ্টাস ব্লিকেরি (Mystus bleekeri)

গুলশা মাছের ইংরেজি নাম: Day’s Mystus

গুলশা মাছের দৈহিক বৈশিষ্ট্য

এ মাছ দেখতে ট্যাংরা মাছের মত তবে আকারে একটু বড়। মাথার দু’পাশে দু’টি বিষাক্ত কাঁটা ও সামনে শিং/মাগুরের মতো গোঁফ ও পিঠের উপরে কাঁটা আছে।

গুলশা মাছের প্রাপ্তিস্থান

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত প্রভৃতি দেশে পাওয়া যায়।

গুলশা মাছের বাসস্থান

নদীনালা, খালবিল, হাওড়বাওড়, ধানক্ষেত, পুকুর ইত্যাদি স্থানে পাওয়া যায়। এ মাছ পানির উপরিস্তরে বাস করে।

গুলশা মাছের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা

প্রতি ১০০ গ্রাম মাছে প্রোটিন ১০.২, ফ্যাট ৫.৮, লোহা ০.২ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৭৮, ফসফরাস ১৮২ মি গ্রা. ও পানি ৭৩.০ ভাগ। রোগীর পথ্য হিসাবে এ মাছ খাওয়া যায়।

গুলশা মাছের চাষ পদ্ধতি গুলশা মাছের একক চাষ,গুলশা মাছের চাষ ব্যবস্থাপনা

গুলশা মাছের প্রজনন

জানুয়ারি থেকে আগষ্ট পর্যন্ত এ মাছের প্রজননকাল। কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে ৪০/৫০ গ্রাম ওজনের প্রজননক্ষম গুলশা মাছ সংগ্রহ করতে হয়। কৃত্রিম প্রজননের ৫-৬ ঘন্টা পূর্বে ব্রুড পুকুর থেকে প্রজননক্ষম গুলশা মাছ ধরে হ্যাচারীতে রাখতে হবে ।

স্ত্রী ও পুরুষ উভয় মাছকে একটি করে পিটুইটারী দ্রবণের ইনজেকশন পৃষ্ঠ পাখনার নীচে দিতে হবে । ইনজেকশন দেয়ার পর ১:১ অনুপাতে পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে হাপাতে রেখে কৃত্রিম ঝর্ণার মাধ্যমে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করতে হবে ।

হাপায় পুরুষ ও স্ত্রী মাছ ছাড়ার ৭-৮ ঘন্ট পরেই মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম দিয়ে থাকে। এই নিষিক্ত ডিম থেকে ২০-২২ ঘন্টা পর রেণূ পোনা ফূটে বের হবে । রেণু পোনা হাপাতে ২-৩ দিন রাখতে হবে । ডিম্বথলি নিঃশেষ হওয়ার পর ১ লক্ষ রেণু পোনার জন্য ১ টি সেদ্ধ ডিমের অর্ধেক প্রতিদিন ৪ বার দিতে হবে ।

গুলশা মাছের পোনা উৎপাদন

পুকুর প্রস্তুতির সময়ে মাছের প্রাকৃতি ক খাদ্য জন্মারোর জন্য শতাংশে ২০ কেজি হারে গোবর সার দিতে হবে । এ সময় নার্সারী পুকুরকে ১.০ মি টার উচু জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে । ফলে ক্ষতিকর রাক্ষুসে ব্যাঙ বা সাপ পুকুরে প্রবেশ করে পোনার ক্ষতি সাধন করতে পারেনা।

প্রতি শতাংশে প্রথম ৩ দিন ২ টি করে ডিমে র কুসুম পানিতে মিশ্রণ করে সকাল, দুপুর ও বিকেলে ছিটিয়ে দিতে হবে । ৮-১৫ দিন সকাল, দুপুর ও বিকেলে ১০০ গ্রাম হারে প্রতি শতাংশে ৪০% প্রোটিন সমৃদ্ধ নার্সারী খাদ্য দিতে হবে। রেণু পোনা ছাড়ার ৩০ দিন পর চারা পোনায় পরিণত হয়, যা চাষের পুকুরে মজুদের জন্য উপয়োগী।

গুলশা মাছের চাষ ব্যবস্থাপনা

পুকুর প্রস্তুতি

সাধারণত ১৫-২৫ শতাংশের যে কোন পুকুরে যেখানে পানির গভীরতা ১.০-১.৫ মি টার এমন পুকুরে এই মাছের একক চাষের জন্য উপযোগী। পুকুরের পাড়ে মেরামত ও জলজ আগাছা পরিস্কার করে নিতে হবে এবং শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ আবশ্যক।

চুন প্রয়োগে র ২-৩ দিন পর শতাংশে ৬ কেজি হারে গোবর সার প্রয়োগ করতে হবে । গোবর সার প্রয়োগের ৪-৫ দি পর প্রতি শতাংশে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি পানিতে গুলিয়ে ছিটিয়ে দিতে হয়।

পোনা মজুদ

সার প্রয়োগের ৩-৪ দিন পর ৩-৪ গ্রাম ওজনের পোনা শতাংশে ২৫০ টি হারে মজুদ করা যেতে পারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার পূর্বে পানির তাপমাত্রা ও অন্যান্য গুনাবলী যাতে সহনশীল হয় সে জন্য পোনাকে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে।

খাদ্য ও সার প্রয়োগ

গুলশা মাছ ছোট পোকামাকড় ও শ্যাওলা খায়। সুষম খাবার হিসাবে চালের কুঁড়া ৪০%, সরিয়ার খৈল ৩০%, ফিশমিল ৩০% ইত্যাদির মিশ্রণে খাবার তৈরি করে প্রজননক্ষম মাছকে খাদ্র সরবরাহ করতে হবে।

পোনা মজুদ করার পর দিন থেকে মাছের দেহ ওজনে র শতকরা ২০-৬০ ভাগ হারে সম্পূরক খাদ্য হিসাবে চালের কুঁড়া (২০%), আটা (৪%), ভিটামিন ও খনিজ লবণ (১%) এর মিশ্রণ সরবরাহ করতে হবে ।

প্রতি ১৫ দিন অন্তর জাল টেনে মাছের দৈহিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে খাদ্যের পরিমাণ বাড়াতে হবে । রেীদ্রজ্জল দিনে জৈব সার গোবর (প্রক্রিয়াজাত) সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে ।

সপ্তাহে একবার পুকুরে হররা টানতে হবে।পুকুরে পানি কমে গেলে বাহির হতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে । পানির স্বচ্ছতা ২০ সেঃমিঃ এর মধ্যে সীমিত থাকলে সার প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে ।

মাছ আহরণ ও উৎপাদন

এই চাষ পদ্ধতি তে ৬ মাসে গুলশা মাছ ৫০-৬০ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে । মাছ আহরণকালে পুকুরের সমস্ত পানি শুকিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা করতে হবে। আধা নিবিড় পদ্ধতিতে গুলশা মাছ চাষ করে ৬-৭ মাসে হেক্টরে ২,২০০ থেকে ২,৫০০ কেজি মাছ উৎপাদন করা যায়।

গুলশা মাছের ছবি

বিভিন্ন শ্রেণীর জনগণের কাছে চাহিদা : এ মাছ অত্যন্ত সুস্বাদু এবং দামও খুব বেশি। বর্তমানে বাজারে এর প্রাপ্যতা কম।

FAQs

গুলশা মাছের দাম কত?

গুলশা মাছ ৩/৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। জাল অথবা পানি সেচের মাধ্যমে এ মাছ ধরে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা যায়। এমনকি বিদেশে রফতানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। বর্তমানে এক কেজি গুলশার দাম ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা।

Resources

  • Bangladesh Fisheries Research Institute

আমি কৃষিবিদ তানজিম আহমেদ, কৃষি বিষয়ক ব্লগার।

You cannot copy content of this page